নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ
পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় তীব্র সংকটে পড়েছে নারায়ণগঞ্জের সিএনজি স্টেশনগুলো। জেলার মোট ৩৩টি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে ৩০টিই বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। ফলে চালু থাকা অল্প কয়েকটি স্টেশনে গ্যাস নিতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই সারি স্টেশন ছাড়িয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
গত কয়েক দিন ধরে চলা এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও অন্যান্য যানবাহনের চালকেরা। পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় অনেক চালককে এক স্টেশন থেকে অন্য স্টেশনে ঘুরতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার কারণে একদিকে যেমন কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কমে যাচ্ছে তাদের দৈনিক আয়।
নগরীর সস্তাপুর এলাকার মাস সিএনজি ওয়ার্কার্স লিমিটেড স্টেশনে দেখা যায়, গ্যাসের অপেক্ষায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পথে অটোরিকশা চালানো মো. সালাউদ্দিন জানান, আগের রাতেও গ্যাস নিতে এসে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেতে হয়েছিল তাকে। পরে সকালে আবার স্টেশনে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। তার ভাষ্য, স্বাভাবিকভাবে গ্যাস পাওয়া গেলে দিনে প্রায় এক থেকে বারোশ টাকা আয় করা সম্ভব হলেও সংকটের কারণে সেই আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
স্টেশনটির কর্মকর্তা প্রকৌশলী কাজী রাকিবুল ইসলাম জানান, গত তিন থেকে চার দিন ধরে বিতরণ লাইনে গ্যাসের চাপ অত্যন্ত কম। ফলে প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় মেশিন চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে। তার তথ্য অনুযায়ী, একটি সিএনজি স্টেশন স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য প্রায় ১৫ পিএসআই চাপ প্রয়োজন হলেও বর্তমানে অনেক সময় সেই চাপ ১ পিএসআইয়ের কাছেও থাকছে না। আগের রাতে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পুরোপুরি গ্যাস সরবরাহ বন্ধ ছিল বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে সাহাবদ্দিন সিএনজি ফিলিং স্টেশনেও একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে প্রাইভেটকার চালক মো. দুলাল হোসেন জানান, স্টেশনে ঢোকার আগেই তাকে প্রায় চার ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার কারণে শুধু চালকেরাই নয়, সড়কে যানজটেরও সৃষ্টি হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
স্টেশনটির কর্মকর্তা মোহাম্মদ নাজমুল হুদা জানান, গত দুই দিন ধরে গ্যাসের চাপ কম থাকায় স্বাভাবিকভাবে সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের সংকট থাকায় সেখানকার অনেক যানবাহন গ্যাসের আশায় নারায়ণগঞ্জের স্টেশনগুলোতে চলে আসছে। এতে চালু থাকা স্টেশনগুলোর ওপর চাপ আরও বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ সিএনজি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপের নারায়ণগঞ্জ-মুন্সীগঞ্জ জোনের সভাপতি সাঈদা আক্তার বলেন, নারায়ণগঞ্জের ৩৩টি পাম্পের মধ্যে ৩০টি বন্ধ রয়েছে। সংকট কতদিন চলবে, সে বিষয়ে এখনো সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা পাওয়া যায়নি। বিষয়টি দ্রুত সমাধানের জন্য পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে গ্যাস সংকটের কারণ সম্পর্কে কিছুটা ব্যাখ্যা দিয়েছে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। নারায়ণগঞ্জ আঞ্চলিক বিপণন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক মনজুর আজিজ মোহন জানান, এলএনজি সরবরাহের প্রধান উৎস এফএসআরইউর দুটি ইউনিটের একটিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল। সেটি মেরামতের পর পুনরায় সংযোগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ কারণেই গত কয়েক দিন ধরে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
তিতাসের এই কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করেছেন, আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে।
তবে আপাতত সংকট অব্যাহত থাকায় নারায়ণগঞ্জের সিএনজি-নির্ভর পরিবহনব্যবস্থায় এর প্রভাব স্পষ্ট। দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা যানবাহন, চালকদের আয় কমে যাওয়া এবং সড়কে বাড়তি যানজট—সব মিলিয়ে গ্যাস সংকট এখন নগরবাসীর জন্য নতুন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
