দেশের অন্যতম শিল্পাঞ্চল নারায়ণগঞ্জে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, ডাইং, ওয়াশিং, টেক্সটাইল, স্পিনিং, নিট ফেব্রিক ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না থাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন কমিয়ে দিতে হয়েছে, আবার কোথাও কোথাও উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখারও নজির দেখা যাচ্ছে। এতে শিল্প উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি শ্রমিক, রপ্তানিকারক এবং সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটটি কেবল একটি জেলার সমস্যা নয়; এটি দেশের রপ্তানি খাত এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। নির্ধারিত সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্য সরবরাহ করা না গেলে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন অর্ডার পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়তে পারে। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জানা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক কম রয়েছে। দিনের বেশিরভাগ সময় অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ এতটাই কম থাকে যে উৎপাদন লাইন সচল রাখা সম্ভব হয় না। কিছু প্রতিষ্ঠান রাতের বেলায় তুলনামূলক গ্যাসের চাপ বাড়লে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করছে। তবে এতে উৎপাদন পরিকল্পনা ভেঙে পড়ছে এবং নির্ধারিত সময়ে অর্ডার সম্পন্ন করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

বিকল্প হিসেবে অনেক কারখানা ডিজেলচালিত জেনারেটর ও অন্যান্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ালেও এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। জ্বালানির অতিরিক্ত খরচ, যন্ত্রপাতির রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এবং উৎপাদন বিলম্ব—সব মিলিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। উদ্যোক্তাদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য সরবরাহের চ্যালেঞ্জের মধ্যেই অতিরিক্ত ব্যয় তাদের ব্যবসাকে আরও কঠিন অবস্থায় ঠেলে দিচ্ছে।

শিল্প মালিকরা জানান, গ্যাস সংকটের কারণে শুধু উৎপাদনই নয়, শ্রমিক ব্যবস্থাপনাও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক কারখানায় শ্রমিকরা কর্মস্থলে উপস্থিত থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে এবং নির্ধারিত ডেলিভারি সময় রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান ও শিল্প খাতের স্থিতিশীলতার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)-এর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এলএনজি সরবরাহ লাইনের জটিলতাসহ বিভিন্ন কারণে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও ঢাকার শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি জানান, এর প্রভাব সরাসরি রপ্তানি কার্যক্রমে পড়তে পারে এবং নির্ধারিত সময়ে বিদেশে পণ্য পাঠানো কঠিন হয়ে যেতে পারে।

তিনি আরও বলেন, দেশের রপ্তানি আয়ের একটি বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক ও নিটওয়্যার শিল্প থেকে। তাই এ খাতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট শুধু উদ্যোক্তাদের নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও উদ্বেগের কারণ। দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানাগুলোকে এই সংকট থেকে উত্তরণে বাস্তবসম্মত সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, নারায়ণগঞ্জ দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। এখানকার শত শত বড়, মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পপ্রতিষ্ঠানে লাখো শ্রমিক কর্মরত। উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়বে শ্রমিকদের আয়, ব্যবসা-বাণিজ্য, রপ্তানি খাত এবং সরকারের রাজস্ব আদায়েও। তাই তারা দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করা, সংকটের প্রকৃত কারণ নিরসন এবং শিল্পবান্ধব দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতি গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে শুধু উৎপাদনই নয়, দেশের শিল্প খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও আরও শক্তিশালী হবে। এজন্য তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত ও দ্রুত পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version