নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ

নারায়ণগঞ্জে ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতার উদ্যোগ শুরু হলেও ঘটনার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে সরকারি তোলারাম কলেজের শের-ই বাংলা ছাত্রাবাসে ভাঙচুর ও মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ফলে রাজনৈতিক বিরোধ মিটলেও শিক্ষার্থীদের হারিয়ে যাওয়া মোবাইল, ল্যাপটপ, ট্যাবসহ অন্যান্য মালামাল আদৌ ফেরত পাওয়া যাবে কি না—এ নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরকে অনেকটা কাছাকাছি অবস্থানে দেখা গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়। বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নানা বিষয়ে মতবিরোধ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে সেই বিরোধ সংঘাতে রূপ নেয়।

এর ধারাবাহিকতায় বুধবার দুপুরে শহরের চাষাঢ়া ও কলেজ রোড এলাকায় দুই পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। প্রায় এক ঘণ্টা ধরে চলা উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি তোলারাম কলেজে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত একটি কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়াকে কেন্দ্র করে তর্ক-বিতর্কের সূত্রপাত হয়। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে কয়েকজন নেতাকর্মীকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। এরপর ঘটনাটি কলেজের বাইরে ছড়িয়ে পড়ে এবং চাষাঢ়া এলাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

পরিস্থিতির একপর্যায়ে ছাত্রশিবিরের একটি মিছিল তোলারাম কলেজের দিকে এগিয়ে যায়। পরে দুই পক্ষের মধ্যে ফের উত্তেজনা সৃষ্টি হলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে এবং একপর্যায়ে শিবিরের নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেয়।

তবে সংঘর্ষের পর সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে তোলারাম কলেজের শের-ই বাংলা ছাত্রাবাসকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, সেখানে ভাঙচুরের পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ও ট্যাব নিয়ে যাওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় না থাকা শিক্ষার্থীরাও হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন।

ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের তোলারাম কলেজ শাখার সভাপতি শাহ মোহাম্মদ সগির হোসেন অভিযোগ করেন, তার কক্ষে ভাঙচুর করে ল্যাপটপসহ মূল্যবান সামগ্রী নিয়ে যাওয়া হয়েছে। একইভাবে আরেক শিক্ষার্থী শরীফ আবদুল্লহ দাবি করেন, তাকে রাজনৈতিক পরিচয়ের সন্দেহে মারধর করা হয়েছে এবং তার ট্যাব, দুটি মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ ও হল ফি’র টাকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তোলারাম কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি মনির হোসেন জিয়া। তার দাবি, একটি ফেসবুক গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে কয়েকজনের মোবাইল সাময়িকভাবে জব্দ করা হয়েছিল এবং পরে সেগুলো হল সুপারের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। তার ভাষ্য, সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানি করা হয়নি।

এদিকে কলেজ কর্তৃপক্ষও ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তে যায়নি। তোলারাম কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. শহীদুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিষয়টি তদন্তে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

এরই মধ্যে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের মধ্যে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষ আলোচনায় বসে সংঘাতের অবসান ঘটানোর চেষ্টা করছে। এতে রাজনৈতিক উত্তেজনা কিছুটা কমার সম্ভাবনা তৈরি হলেও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত মালামাল উদ্ধারের বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত।

শিক্ষার্থীদের দাবি, রাজনৈতিক বিরোধ যারাই করুক, তার দায় যেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর না পড়ে। সংঘর্ষের ঘটনায় যাদের ব্যক্তিগত মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত বা হারিয়ে গেছে, তদন্তের মাধ্যমে সেগুলো শনাক্ত করে দ্রুত ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।

রাজনৈতিক সমঝোতার পাশাপাশি তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—সাধারণ শিক্ষার্থীদের হারিয়ে যাওয়া মালামালের দায়িত্ব কে নেবে এবং তারা কবে তাদের ক্ষতিপূরণ বা মালামাল ফিরে পাবেন?

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version