নিজস্ব প্রতিবেদক | সোনারগাঁ, নারায়ণগঞ্জ

দেশের অন্যতম ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ অংশ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাবে ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক টানা বর্ষণের পর মহাসড়কের প্রায় ১৪ কিলোমিটার এলাকায় অসংখ্য ছোট-বড় খানাখন্দ সৃষ্টি হওয়ায় প্রতিদিন হাজারো যানবাহন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছে। স্থানীয়দের ভাষায়, দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত এই মহাসড়কের অংশটি এখন কার্যত ‘মরণফাঁদে’ পরিণত হয়েছে।

কাঁচপুর থেকে মেঘনা পর্যন্ত বেহাল চিত্র

সরেজমিনে দেখা যায়, কাঁচপুর সেতুর পূর্ব প্রান্ত থেকে চেঙ্গাইন, মদনপুর, কেওঢালা, লাঙ্গলবন্দ, সোনাখালী, দড়িকান্দি, টিপুরদী, হাবিবপুর, মোগরাপাড়া চৌরাস্তা হয়ে মেঘনা সেতুর টোল প্লাজা পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন অংশে কার্পেটিং উঠে গেছে। কোথাও কোথাও বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে, আবার অনেক স্থানে রাস্তার পিচ সম্পূর্ণ উঠে গিয়ে ইট-পাথর বেরিয়ে এসেছে।

টানা বৃষ্টিতে এসব গর্তে পানি জমে থাকায় চালকেরা গর্তের গভীরতা বুঝতে না পেরে হঠাৎ গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছেন। এতে প্রায় প্রতিদিনই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

রাতে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও ছিনতাইয়ের শঙ্কা

দিনের তুলনায় রাতের বেলায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। পর্যাপ্ত আলোর অভাব এবং পানিতে ডুবে থাকা গর্তগুলো সহজে চোখে না পড়ায় যানবাহন প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট তৈরি হয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাতের বেলায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কোনো গাড়ি দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে চালক ও যাত্রীরা ছিনতাইয়ের আশঙ্কায় আতঙ্কিত থাকেন। ফলে নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।

যাত্রীদের ভোগান্তি চরমে

শ্যামলী পরিবহনের যাত্রী মার্জিয়া ইসলাম বলেন,

“দিনের বেলা কোনোভাবে গর্ত এড়িয়ে চলা গেলেও রাতে চলাচল খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। অনেক সময় গাড়ির চাকা গর্তে আটকে যায়, আবার যন্ত্রাংশও নষ্ট হয়ে যায়। এতে আমাদের মতো সাধারণ যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দ্রুত স্থায়ীভাবে সড়কটি সংস্কার করা প্রয়োজন।”

চালকদের ক্ষোভ

প্রাইভেটকার চালক জিহাদুল ইসলাম জিতু বলেন,

“একবার গাড়ির চাকা বড় গর্তে পড়ে গেলে নিয়ন্ত্রণ রাখা কঠিন হয়ে যায়। এই অবস্থায় মহাসড়কে নিরাপদে গাড়ি চালানো প্রায় অসম্ভব। এটি এখন আর মহাসড়ক নয়, যেন একটি মরণফাঁদ।”

পরিবহন চালক কবির মিয়া বলেন,

“প্রতিবছরই এই অংশে দায়সারাভাবে মেরামতের কাজ হয়। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আবার রাস্তা আগের মতো নষ্ট হয়ে যায়। স্থায়ী সমাধান না করলে এই দুর্ভোগ কখনোই শেষ হবে না।”

কী বলছে সওজ?

নারায়ণগঞ্জ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহিম জানান, টানা বৃষ্টির কারণে নতুন করে বিভিন্ন স্থানে খানাখন্দ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি সড়কের দুই পাশের ঘাস-ঝোপের কারণে পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়ায় রাস্তার ক্ষতি আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন,

“মহাসড়ক সংস্কারের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। তবে টানা বৃষ্টির কারণে কাজের গতি কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সড়কটি চলাচলের জন্য নিরাপদ করার চেষ্টা করা হবে।”

স্থায়ী সমাধানের দাবি

সড়ক ব্যবহারকারী, স্থানীয় বাসিন্দা এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রতি বছর একই ধরনের সমস্যার পুনরাবৃত্তি ঘটলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। তাদের দাবি, বারবার অস্থায়ী সংস্কারের পরিবর্তে আধুনিক ও টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সোনারগাঁ অংশ পুনর্নির্মাণ করা হোক।

তাদের মতে, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের অন্যতম প্রধান এই মহাসড়ক নিরাপদ ও টেকসই না হলে শুধু যাত্রীসাধারণ নয়, পণ্য পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জাতীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়ার বিকল্প নেই।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version