নিজস্ব প্রতিবেদক | নারায়ণগঞ্জ
একসময় নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে তাদের উপস্থিতিই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। দলীয় কর্মসূচি, প্রশাসনিক বৈঠক, স্থানীয় বিরোধ মীমাংসা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত—প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছিল তাদের দৃশ্যমান প্রভাব। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আওয়ামী লীগের চার সাবেক সংসদ সদস্যের অধিকাংশই এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে।
নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের চার সাবেক এমপিকে ঘিরে বর্তমানে নানা আলোচনা রয়েছে। তাদের একজন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসংক্রান্ত মামলায় কারাগারে রয়েছেন। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক এমপি শামীম ওসমান এবং নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সাবেক এমপি নজরুল ইসলাম বাবুকে সম্প্রতি প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। তবে নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা এবং নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সাবেক এমপি সেলিম ওসমান দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনুপস্থিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গত দুই বছরের বেশি সময়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে যে বড় পরিবর্তন এসেছে, সাবেক এমপিদের অনুপস্থিতি তার অন্যতম দৃশ্যমান উদাহরণ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রত্যেকেরই নিজস্ব রাজনৈতিক বলয় ও প্রভাব ছিল। স্থানীয় সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে দলীয় কর্মসূচি—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো।
তৃণমূলের সঙ্গেও ছিল তাদের নিয়মিত যোগাযোগ। সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়া, নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠক এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে স্থানীয় পর্যায়ে তাদের প্রভাবও ছিল স্পষ্ট। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে সমন্বয় এবং স্থানীয় সমস্যা সমাধানে তাদের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা ছিল। ফলে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলে যাওয়ার পর তাদের অনুপস্থিতি নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলা ও গ্রেপ্তার শুরু হয়। নারায়ণগঞ্জেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ পরবর্তী বিভিন্ন ঘটনায় একাধিক মামলা হয়েছে। এসব মামলায় সাবেক জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে তৃণমূলের নেতাকর্মীরাও আসামি হয়েছেন।
এদিকে শামীম ওসমান ও নজরুল ইসলাম বাবুকে সম্প্রতি প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে দেখা গেলেও তাদের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা আবার পূর্ণাঙ্গভাবে রাজনীতিতে ফিরতে পারবেন কি না কিংবা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তাদের ভূমিকা কী হবে—তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে লিয়াকত হোসেন খোকা ও সেলিম ওসমানের দীর্ঘ অনুপস্থিতি নিয়েও স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। একসময় নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় সক্রিয় থাকা এই দুই সাবেক এমপিকে এখন প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে খুব একটা দেখা যাচ্ছে না।
সাবেক এমপিদের পাশাপাশি তাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত অনেক নেতাকর্মীকেও আগের মতো প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না। কেউ মামলা ও গ্রেপ্তারের আশঙ্কায় এলাকা ছেড়েছেন, কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছে অবস্থান করছেন, আবার কেউ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ মনে করছে।
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও এ নিয়ে হতাশা রয়েছে। তাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক সংকটের সময়ে মাঠপর্যায়ের কর্মীরা মামলা ও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়লেও শীর্ষ নেতাদের বড় একটি অংশ তাদের পাশে নেই। এতে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সম্পর্ক ও নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
সব মিলিয়ে নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে চার সাবেক এমপির বর্তমান অবস্থান শুধু ব্যক্তিগত অনুপস্থিতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণও। তারা যদি ভবিষ্যতে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফেরেন, তাহলে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মাঠে তার প্রভাব কতটা পড়বে—এখন সেটিই দেখার বিষয়।
