স্টাফ রিপোর্টার | নারায়ণগঞ্জ

একসময় আন্দোলন-সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জ বিএনপি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সমন্বয় সংকট, নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা নিয়ে নানা আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। জেলা, মহানগর এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ে মতপার্থক্য, পৃথক কর্মসূচি এবং নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়হীনতার অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে।

দলীয় নেতাকর্মীদের একটি অংশের দাবি, বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, বরং নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়। তাদের মতে, সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড দুর্বল হয়ে পড়ায় অনেক ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় কিংবা জেলা পর্যায়ের সিদ্ধান্ত মাঠপর্যায়ে যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ফলে নেতৃত্বের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনের মধ্যে চারটিতে বিএনপির প্রার্থীরা বিজয়ী হন। একই সঙ্গে সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দল-সমর্থিত ব্যক্তিরা দায়িত্ব পান। তবে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে শক্ত অবস্থানে পৌঁছানোর পরও জেলা ও মহানগর বিএনপিকে সাংগঠনিকভাবে ঐক্যবদ্ধ রাখা সম্ভব হয়নি।

সম্প্রতি জেলা বিএনপির কার্যালয়কে ঘিরে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা এই সমন্বয় সংকটকে আরও আলোচনায় নিয়ে আসে। নির্বাচনের পর সিদ্ধিরগঞ্জে জেলা বিএনপির নতুন কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়। সেখানে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ, জেলার চার সংসদ সদস্যের ছবি এবং জেলা বিএনপির সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।

কিন্তু গত ১৮ জুন সোনারগাঁ–সিদ্ধিরগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের অনুসারীরা ওই কার্যালয়ে গিয়ে জেলা বিএনপির সাইনবোর্ড অপসারণ করে সেখানে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির সাইনবোর্ড স্থাপন করেন। একই সঙ্গে অন্য তিন সংসদ সদস্যের ছবি সরিয়ে শুধুমাত্র আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছবি রাখা হয়। ঘটনাটি দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়। পরে সমালোচনার মুখে আগের সাইনবোর্ড পুনঃস্থাপন করা হয়।

এই ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই ২১ জুন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আজহারুল ইসলাম মান্নানের ছেলে এবং জেলা যুবদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম সজীবকে নিয়ে যায়। একই রাতে কেন্দ্রীয় যুবদল তাকে জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়কের পদ থেকে বহিষ্কার করে। পরে মুচলেকার ভিত্তিতে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। ঘটনাটি নিয়েও দলীয় অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়।

দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের অনেকেই বর্তমানে বিভিন্ন সাংবিধানিক, প্রশাসনিক কিংবা ব্যক্তিগত দায়িত্বে ব্যস্ত থাকায় সাংগঠনিক কার্যক্রমে আগের মতো সমন্বয় দেখা যাচ্ছে না। আহ্বায়ক মামুন মাহমুদ জেলা পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। যুগ্ম আহ্বায়ক মাশুকুল ইসলাম রাজীব এনডিএর চেয়ারম্যানের দায়িত্বে রয়েছেন। অন্যদিকে শরীফ আহমেদ টুটুল ব্যক্তিগত ব্যবসায় ব্যস্ত এবং সদস্য মোহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বর্তমানে বহিষ্কার অবস্থায় রয়েছেন।

শুধু জেলা বিএনপি নয়, মহানগর বিএনপিতেও সমন্বয়ের ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাখাওয়াত হোসেন খান এবং সদস্য সচিব আবু আল ইউসুফ খান টিপুকে দীর্ঘদিন ধরেই পৃথক কর্মসূচিতে অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। এছাড়া যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল কাউসার আশা নিজ নির্বাচনী এলাকাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেশি সময় দিচ্ছেন বলেও দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ।

একই ধরনের পরিস্থিতি যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং অন্যান্য সহযোগী সংগঠনেও দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন না হওয়ায় পুরোনো নেতৃত্বই বিভিন্ন ইউনিট পরিচালনা করছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, নতুন নেতৃত্বের বিকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে এবং অনেক থানা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড কমিটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে।

দলীয় সূত্রের ভাষ্য, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নিয়মিত কাউন্সিল ও সম্মেলনের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও বহু বছর ধরে সেই প্রক্রিয়া কার্যকরভাবে সম্পন্ন হয়নি। এর ফলে নেতৃত্বের বৈধতা, জবাবদিহিতা এবং দায়িত্ব বণ্টন নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জ বিএনপির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ঐক্য বজায় রাখা। তাদের মতে, দ্রুত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন, সাংগঠনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, চেইন অব কমান্ড শক্তিশালী করা এবং অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

তৃণমূল নেতাকর্মীদের প্রত্যাশা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিবর্তে সংগঠনভিত্তিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি আবারও সুসংগঠিত ও কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version