বাংলা নববর্ষ ও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সিদ্ধেশ্বরী বটমেলা আবারও পরিণত হয়েছে হাজারো ভক্তের মিলনমেলায়। শতবর্ষের পুরোনো বটগাছকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এ মেলায় সকাল থেকেই ভিড় করেন নারী-পুরুষ, বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বী নারীরা। সংসারের সুখ-শান্তি, স্বামী-সন্তানের মঙ্গল এবং পারিবারিক সমৃদ্ধি কামনায় তারা বটগাছের নিচে পূজা ও অর্চনা করেন।
স্থানীয়ভাবে এই প্রাচীন বটগাছটি ‘সিদ্ধেশ্বরী দেবী’ নামে পরিচিত। এলাকাবাসীর বিশ্বাস, বহু বছর ধরে এই বটতলায় পূজা দিলে মনোবাসনা পূরণ হয় এবং পরিবারে সুখ-সমৃদ্ধি বজায় থাকে। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রতিবছর পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে এখানে ঐতিহ্যবাহী বটমেলার আয়োজন করা হয়।
এবারও বৈশাখের দ্বিতীয় দিন থেকে উপজেলার ভট্টপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন জয়রামপুর গ্রামে শুরু হয় মেলার আনুষ্ঠানিকতা। সকাল থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা এসে পূজায় অংশ নেন। মেলার প্রধান আকর্ষণ ছিল বটগাছের নিচে পূজা, প্রসাদ বিতরণ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান।
পূজায় অংশ নিতে আসা নারীদের হাতে দেখা যায় কাঁচা আম, কলা, শসা, বাতাসা, বিভিন্ন মৌসুমি ফল এবং পূজার অন্যান্য উপকরণ। দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তারা বটতলায় প্রসাদ নিবেদন করেন এবং দেবীর আশীর্বাদ কামনা করেন। পূজা শেষে অনেকেই পরিবারের সদস্যদের জন্য প্রসাদ নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
পূজায় অংশ নেওয়া অনামিকা রাণী দাস বলেন, প্রতিবছরের মতো এবারও তিনি পরিবারের সুখ-শান্তি, স্বামী-সন্তানের সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ কামনা করে পূজা দিতে এসেছেন। তার বিশ্বাস, আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করলে সিদ্ধেশ্বরী দেবীর আশীর্বাদে পরিবারের অমঙ্গল দূর হয় এবং জীবনে শান্তি ফিরে আসে।
আরেক ভক্ত গৃহবধূ রাণী শীল জানান, বছরের প্রতিটি দিন যেন সুখ-সমৃদ্ধিতে কাটে—এই প্রত্যাশা নিয়েই তিনি প্রতি বছর বটমেলায় আসেন। তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এই মেলায় আসার একটি ঐতিহ্য রয়েছে, যা এখনও ধরে রেখেছেন।
ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলাকে ঘিরে বসেছে নানা ধরনের অস্থায়ী দোকান। কাঠ ও মাটির তৈরি খেলনা, হাতি-ঘোড়া, পাখি, শিশুদের বিভিন্ন সামগ্রী, রঙিন বাঁশি, টেপা পুতুল, গৃহস্থালি পণ্য, মিষ্টি, মুড়ি-মুড়কি এবং বিভিন্ন ধরনের খাবারের দোকানে ছিল দর্শনার্থীদের ভিড়। ফলে ধর্মীয় অনুষ্ঠানের পাশাপাশি মেলাটি পরিণত হয়েছে এক প্রাণবন্ত লোকজ উৎসবে।
মেলা আয়োজক কমিটির সভাপতি নিলেশ পাল বলেন, শতবর্ষের ঐতিহ্য ধরে রাখতে প্রতিবছরের মতো এবারও সবার সহযোগিতায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মেলার আয়োজন করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছাড়াও এই মেলা এলাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতেও এই ঐতিহ্য অক্ষুণ্ন থাকবে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে লোকজ সংস্কৃতি তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয়দের মতে, সিদ্ধেশ্বরী বটমেলা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। প্রতিবছর এই মেলাকে ঘিরে বিভিন্ন ধর্ম ও শ্রেণি-পেশার মানুষের মিলন ঘটে, যা এলাকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও লোকজ সংস্কৃতিকে আরও সমৃদ্ধ করে।
